বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি নির্দেশিকা — ২০২৬
মো. জয়নাল আবদিন
ব্যবসা পরামর্শক | উদ্যোক্তা | আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (টিঅ্যান্ডআইবি)
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিবিসিসিআই)
ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজার। দেশটির জনসংখ্যা ২১ কোটিরও বেশি। বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক হলেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বর্তমানে তৈরি পোশাকের আধিপত্য থাকলেও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, গৃহস্থালি বস্ত্র, ওষুধ, সিরামিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্যসহ বেশ কিছু খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ব্রাজিলের বিশেষ গুরুত্ব হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অন্যান্য প্রচলিত বাজারের বাইরে রপ্তানি গন্তব্য বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ। ব্রাজিলের আমদানিকারক ও ক্রেতারা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক মান, টেকসই উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক শিল্পের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।
এই নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে:
- ব্রাজিলে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি রপ্তানি পণ্য;
- প্রতিটি পণ্যের বাজার সম্ভাবনা ও সম্ভাব্য ক্রেতা;
- রপ্তানির পূর্বপ্রস্তুতি ও মান পরিপালন;
- ব্রাজিলের ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার পদ্ধতি;
- বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে পণ্য রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া;
- রপ্তানির পর ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ;
- বিদ্যমান ক্রেতাকে ধরে রাখা; এবং
- একই ধরনের আরও ব্রাজিলীয় ক্রেতা সংগ্রহের কৌশল।
কেন ব্রাজিল বাংলাদেশের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য হতে পারে?
ব্রাজিলের বিশাল জনসংখ্যা, শক্তিশালী শিল্পখাত, বড় খুচরা বাজার এবং বৈচিত্র্যময় ভোক্তা চাহিদা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুযোগ সৃষ্টি করে। দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো:
- ২১ কোটির বেশি ভোক্তা: ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম ভোক্তা বাজার।
- শক্তিশালী আমদানি চাহিদা: দেশটিতে শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে পোশাক, ভোগ্যপণ্য, ওষুধ, খাদ্য এবং বিভিন্ন প্রস্তুত পণ্যের বড় বাজার রয়েছে।
- সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সুযোগ: বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলের সান্তোসসহ প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে।
- বৃহৎ ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা বাজার: ব্রাজিলে বিপুলসংখ্যক আমদানিকারক, পরিবেশক, পাইকার, খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব নামে পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ব্রাজিলে পরিচিত সরবরাহকারী দেশ। একই সঙ্গে পাটজাত পণ্য, চামড়া ও জুতা, ওষুধ, গৃহস্থালি বস্ত্র, সিরামিক, বাইসাইকেল এবং অন্যান্য পণ্যের জন্যও নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রাজিলের বাজারে চাহিদাসম্পন্ন বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি রপ্তানি পণ্য
১. তৈরি পোশাক
তৈরি পোশাক ব্রাজিলে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যগুলোর একটি। বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী এবং বৃহৎ পরিমাণে মানসম্মত পোশাক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উৎপাদনের সক্ষমতা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা। ব্রাজিলের বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন বাজার, বড় খুচরা বিক্রয় ব্যবস্থা এবং মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কারণে পোশাকের চাহিদা ব্যাপক।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- টি-শার্ট
- পোলো শার্ট
- ডেনিম প্যান্ট
- জিনস
- শার্ট
- ট্রাউজার
- জ্যাকেট
- খেলাধুলার পোশাক
- শিশুদের পোশাক
- অন্তর্বাস
- সোয়েটার
- হুডি
- বিভিন্ন ধরনের নিট ও ওভেন পোশাক
সম্ভাব্য ক্রেতা
- ফ্যাশন ব্র্যান্ড
- পোশাক আমদানিকারক
- পাইকার
- খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান
- সুপারমার্কেট ও বৃহৎ বিক্রয়শৃঙ্খল
- অনলাইন পোশাক বিক্রেতা
- নিজস্ব নামে পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা
বাংলাদেশের রয়েছে বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং ক্রমবর্ধমান পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কারখানা অবকাঠামো।
২. চামড়াজাত পণ্য ও জুতা
বাংলাদেশের চামড়া ও জুতা শিল্প ব্রাজিলের বাজারে সম্ভাবনাময় আরেকটি খাত। ব্রাজিল নিজেও বিশ্বের উল্লেখযোগ্য চামড়া ও জুতা উৎপাদনকারী দেশ। ফলে এই বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবে এর অর্থ একই সঙ্গে দেশটিতে চামড়াজাত পণ্যের বিশাল উৎপাদন, বিপণন ও ভোগের বাজার বিদ্যমান। বাংলাদেশি উৎপাদকরা মান, নকশা এবং মূল্য প্রতিযোগিতার সমন্বয় করতে পারলে নির্দিষ্ট বাজার অংশে ভালো সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- চামড়ার জুতা
- ফ্যাশন জুতা
- হ্যান্ডব্যাগ
- মানিব্যাগ
- বেল্ট
- অফিস ব্যাগ
- ভ্রমণ ব্যাগ
- ছোট চামড়াজাত সামগ্রী
- নিজস্ব ব্র্যান্ডে উৎপাদিত চামড়াজাত পণ্য
সম্ভাব্য ক্রেতা
ব্রাজিলের জুতা আমদানিকারক, ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান, পাইকার, খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান, অনলাইন বিক্রেতা এবং নিজস্ব ব্র্যান্ডে পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করা যেতে পারে।
৩. পাট ও পরিবেশবান্ধব পণ্য
বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাট উৎপাদনকারী দেশ। কাঁচা পাটের পাশাপাশি মূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ব্রাজিলে আরও লাভজনক বাজার তৈরি করা সম্ভব।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- পাটের কেনাকাটার ব্যাগ
- পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ
- মদের বোতলের পাটের ব্যাগ
- পাটের কার্পেট
- পাটের মাদুর
- পাটের ঝুড়ি
- গৃহসজ্জার সামগ্রী
- প্রচারণামূলক ব্যাগ
- পাটের তৈরি উপহারসামগ্রী
- পরিবেশবান্ধব মোড়কজাত পণ্য
বিশেষ সুযোগ
ব্রাজিলের সুপারমার্কেট, পরিবেশবান্ধব পণ্যের দোকান, উপহারসামগ্রী বিক্রেতা, প্রচারণামূলক পণ্য সরবরাহকারী এবং বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য বাজারজাত করা যেতে পারে।
৪. গৃহস্থালি বস্ত্র
বাংলাদেশের গৃহস্থালি বস্ত্র শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো অবস্থান রয়েছে। ব্রাজিলের বিশাল আবাসন, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং খুচরা বিক্রয় বাজারের কারণে এই খাতে সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- বিছানার চাদর
- বালিশের আচ্ছাদন
- তোয়ালে
- গোসলের তোয়ালে
- পর্দা
- কুশনের আচ্ছাদন
- টেবিলের কাপড়
- রান্নাঘরের তোয়ালে
- হোটেলের বিছানার সামগ্রী
- হাসপাতালের বস্ত্রপণ্য
সম্ভাব্য ক্রেতা
- গৃহসজ্জা পণ্যের আমদানিকারক
- হোটেল সরবরাহকারী
- খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান
- সুপারমার্কেট
- অনলাইন বিক্রেতা
- হোটেল ও রিসোর্ট
- নিজস্ব ব্র্যান্ডে পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান
উন্নত নকশা, তুলার মান, রঙের স্থায়িত্ব, আকর্ষণীয় মোড়ক এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।
৫. ওষুধ
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দেশের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর ও সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ব্রাজিলের বিশাল জনসংখ্যা এবং বড় স্বাস্থ্যসেবা বাজারের কারণে ওষুধের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। তবে এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজার।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- ট্যাবলেট
- ক্যাপসুল
- সিরাপ
- ইনজেকশন
- জেনেরিক ওষুধ
- বিভিন্ন চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রস্তুতি
- সক্রিয় ওষুধ উপাদান
গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক বিষয়
ব্রাজিলে ওষুধ, চিকিৎসা উপকরণ এবং স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ANVISA-এর বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। ফলে কোনো বাংলাদেশি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে শুধু ক্রেতা খুঁজলেই হবে না। পণ্য নিবন্ধন, কারখানার মান, উৎপাদন প্রক্রিয়া, নথিপত্র এবং ব্রাজিলের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক শর্তগুলো আগেই যাচাই করতে হবে। এই খাতে বাজার সম্ভাবনা অনেক বেশি হলেও বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতিও তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি।
৬. সিরামিক টেবিলওয়্যার ও সংশ্লিষ্ট পণ্য
বাংলাদেশের সিরামিক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ পরিচিত হচ্ছে। উন্নত নকশা, মান এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে বাংলাদেশি সিরামিক পণ্য ব্রাজিলের নির্দিষ্ট বাজার অংশে সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- ডিনার সেট
- প্লেট
- বাটি
- কাপ ও সসার
- কফির মগ
- হোটেলের ক্রোকারিজ
- সাজসজ্জার সিরামিক
- বিভিন্ন ধরনের টেবিলওয়্যার
সম্ভাব্য ক্রেতা
- সিরামিক আমদানিকারক
- হোটেল ও রেস্তোরাঁ সরবরাহকারী
- গৃহস্থালি পণ্য বিক্রেতা
- সুপারমার্কেট
- খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান
- নিজস্ব ব্র্যান্ডে পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান
এক্ষেত্রে পণ্যের নকশা, ভাঙন প্রতিরোধী মোড়ক, গুণগত মান এবং ক্রেতার নিজস্ব নকশায় উৎপাদনের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
৭. হিমায়িত সামুদ্রিক খাদ্য
বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি ও মাছের আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে। ব্রাজিলের নিজস্ব মৎস্যসম্পদ থাকলেও দেশটির বিশাল খাদ্যবাজারে নির্দিষ্ট ধরনের আমদানিকৃত সামুদ্রিক খাদ্যের সুযোগ রয়েছে।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- বাগদা চিংড়ি
- হিমায়িত চিংড়ি
- মাছের ফিলে
- মূল্য সংযোজিত সামুদ্রিক খাদ্য
- প্রক্রিয়াজাত হিমায়িত মাছ
সম্ভাব্য ক্রেতা
- সামুদ্রিক খাদ্য আমদানিকারক
- খাদ্য পরিবেশক
- সুপারমার্কেট
- হোটেল
- রেস্তোরাঁ
- খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান
তবে খাদ্যপণ্য এবং প্রাণিজ পণ্যের ক্ষেত্রে ব্রাজিলের স্বাস্থ্য, স্যানিটারি এবং কৃষি-সংক্রান্ত নিয়ম কঠোর। তাই সংশ্লিষ্ট ব্রাজিলীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, সনদ, স্বাস্থ্যবিধি এবং আমদানি শর্ত যাচাই না করে চালান পাঠানো উচিত নয়।
৮. কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য
ব্রাজিল নিজেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশ। তাই সাধারণ কৃষিপণ্যের পরিবর্তে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র, মূল্য সংযোজিত এবং বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- মসলা
- আমের পাল্প
- আচার
- বিস্কুট
- নাশতাজাতীয় খাবার
- চানাচুরজাতীয় পণ্য
- চা
- বিশেষ ধরনের বাংলাদেশি খাদ্য
- প্রস্তুত খাবার
- হালাল খাদ্যপণ্য
সম্ভাব্য বাজার
ব্রাজিলের এশীয় খাদ্য আমদানিকারক, বিশেষায়িত খাদ্যের দোকান, সুপারমার্কেট, খাদ্য পরিবেশক এবং হালাল খাদ্যের বাজার লক্ষ্য করা যেতে পারে। খাদ্যের উপাদান, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, পুষ্টিগত তথ্য এবং পর্তুগিজ ভাষায় প্রয়োজনীয় লেবেলিংয়ের বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে।
৯. বাইসাইকেল
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে বাইসাইকেল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে একটি অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশে তৈরি বাইসাইকেল দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। ব্রাজিলের বড় শহরগুলোতে যানজট, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বিনোদনমূলক সাইক্লিং এবং নগর চলাচলের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বাইসাইকেলের ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- শহরে ব্যবহারের বাইসাইকেল
- শিশুদের বাইসাইকেল
- সাধারণ যাতায়াতের বাইসাইকেল
- খেলাধুলার বাইসাইকেল
- নিজস্ব ব্র্যান্ডে উৎপাদিত বাইসাইকেল
সম্ভাব্য ক্রেতা
- বাইসাইকেল আমদানিকারক
- পরিবেশক
- খেলাধুলার সামগ্রী বিক্রেতা
- খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান
- অনলাইন বিক্রেতা
- সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা
১০. হালকা প্রকৌশল ও রান্নাঘরের সামগ্রী
বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল খাতের সক্ষমতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঠিক মান, নকশা ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকলে ব্রাজিলের বাজারে কিছু হালকা প্রকৌশল এবং গৃহস্থালি ধাতব পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব।
সম্ভাবনাময় পণ্য
- স্টেইনলেস স্টিলের রান্নার সামগ্রী
- রান্নাঘরের বিভিন্ন উপকরণ
- ধাতব গৃহস্থালি সামগ্রী
- হার্ডওয়্যার
- ছোট প্রকৌশল পণ্য
- বিভিন্ন শিল্প উপাদান ও যন্ত্রাংশ
সম্ভাব্য ক্রেতা
ব্রাজিলের আমদানিকারক, হার্ডওয়্যার পরিবেশক, রান্নাঘরের সামগ্রী বিক্রেতা, সুপারমার্কেট, গৃহস্থালি পণ্য বিক্রয় প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা যেতে পারে।
পণ্যভিত্তিক সম্ভাবনার তুলনামূলক চিত্র
| পণ্য | সম্ভাব্য চাহিদা | প্রতিযোগিতা | লাভের সম্ভাবনা |
| তৈরি পোশাক | অত্যন্ত বেশি | বেশি | বেশি |
| চামড়াজাত পণ্য | বেশি | মাঝারি থেকে বেশি | বেশি |
| পাটজাত পণ্য | বেশি | তুলনামূলক কম | বেশি |
| গৃহস্থালি বস্ত্র | বেশি | মাঝারি | বেশি |
| ওষুধ | বেশি | মাঝারি | অত্যন্ত বেশি |
| সিরামিক | বেশি | মাঝারি | বেশি |
| হিমায়িত সামুদ্রিক খাদ্য | মাঝারি থেকে বেশি | মাঝারি | বেশি |
| প্রক্রিয়াজাত খাদ্য | মাঝারি | মাঝারি | মাঝারি |
| বাইসাইকেল | মাঝারি | মাঝারি | বেশি |
| হালকা প্রকৌশল ও রান্নাঘরের সামগ্রী | মাঝারি | মাঝারি | মাঝারি |
ধাপ ১: সঠিক রপ্তানি পণ্য নির্বাচন করুন
ব্রাজিলে রপ্তানি শুরু করার প্রথম কাজ হওয়া উচিত পণ্য নির্বাচন। শুধু বাংলাদেশে পণ্যটি সহজে পাওয়া যায় বলেই সেটি ব্রাজিলে রপ্তানি করা উচিত নয়। পাঁচটি বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
১. বাজারে চাহিদা: ব্রাজিল কি ওই পণ্যটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি করছে?
২. উৎপাদন সক্ষমতা: আপনি কি নিয়মিতভাবে একই মানের পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন?
৩. গুণগত মান: পণ্যটি কি আন্তর্জাতিক এবং ব্রাজিলীয় মান পূরণ করতে সক্ষম?
৪. সনদ ও অনুমোদন: প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, সনদ, নিবন্ধন এবং অনুমোদন সংগ্রহ করা সম্ভব কি না তা যাচাই করুন।
৫. মূল্য প্রতিযোগিতা: পণ্যের উৎপাদন মূল্য, মোড়ক, পরিবহন, বন্দর খরচ, সমুদ্রভাড়া, বিমা এবং ব্রাজিলের আমদানি শুল্ক বিবেচনার পরও আপনার পণ্য কি প্রতিযোগিতামূলক থাকবে?
নতুন রপ্তানিকারকের জন্য প্রথমে একটি পণ্য বা একটি নির্দিষ্ট পণ্যশ্রেণি নিয়ে কাজ শুরু করাই উত্তম।
ধাপ ২: বাংলাদেশে রপ্তানি ব্যবসার আইনি প্রস্তুতি নিন
রপ্তানি শুরু করার আগে আপনার ব্যবসার প্রয়োজনীয় আইনি নিবন্ধন ও কাগজপত্র সম্পন্ন করতে হবে। ব্যবসার ধরন ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সাধারণত নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে:
- হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স
- করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর
- ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর বা প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর নিবন্ধন
- রপ্তানি নিবন্ধন সনদ
- ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ
- পণ্যভেদে প্রয়োজনীয় সনদ ও অনুমোদন
পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি অনুযায়ী রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের নিয়ম যাচাই করা উচিত।
ধাপ ৩: প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করুন
ব্রাজিলের একজন আমদানিকারক প্রথমেই আপনার কারখানা দেখতে বাংলাদেশে আসবেন এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক মূল্যায়ন সাধারণত অনলাইনেই শুরু হবে। তাই একটি আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক পরিচিতি তৈরি করা জরুরি।
প্রস্তুত রাখুন
- পেশাদার প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিপত্র
- পণ্যের বিস্তারিত তালিকা
- উন্নতমানের পণ্যের ছবি
- পণ্যের কারিগরি বিবরণ
- উৎপাদন সক্ষমতা
- ন্যূনতম অর্ডারের পরিমাণ
- সরবরাহের সম্ভাব্য সময়
- আন্তর্জাতিক সনদ
- কারখানার ছবি
- বিদ্যমান রপ্তানি বাজারের তথ্য
- পেশাদার ওয়েবসাইট
- প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডোমেইনের ই-মেইল
একটি দুর্বল ওয়েবসাইট, অপরিষ্কার পণ্যের ছবি অথবা অসম্পূর্ণ ব্যবসায়িক পরিচিতি সম্ভাব্য ক্রেতার আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
ধাপ ৪: ব্রাজিলের আমদানি বিধি বুঝুন
ব্রাজিলে পণ্য পাঠানোর আগে পণ্যটির সঠিক এইচএস কোড নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর ওপর নির্ভর করতে পারে:
- আমদানি শুল্ক
- কর
- নিয়ন্ত্রক অনুমোদন
- সনদ
- লেবেলিং
- পণ্যের পরীক্ষা
- কাস্টমস প্রক্রিয়া
খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী, প্রাণিজ খাদ্য এবং কিছু নিয়ন্ত্রিত পণ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। ওষুধ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে ব্রাজিলের ANVISA, আর কৃষি, প্রাণিজ ও কিছু খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্রাজিলীয় কৃষি কর্তৃপক্ষের বিধিবিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চালান পাঠানোর আগে ব্রাজিলীয় আমদানিকারকের কাছ থেকেও লিখিতভাবে পণ্যটির আমদানি শর্ত নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়।
ধাপ ৫: ব্রাজিলের ক্রেতা খুঁজে বের করুন
রপ্তানি ব্যবসায় পণ্য উৎপাদনের চেয়ে অনেক সময় ভালো ক্রেতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই পরিকল্পিতভাবে ক্রেতা অনুসন্ধান করতে হবে।
পদ্ধতি ১: লিংকডইনের মাধ্যমে ক্রেতা অনুসন্ধান
প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানে নিচের ধরনের কর্মকর্তাদের খুঁজুন:
- আমদানি ব্যবস্থাপক
- ক্রয় ব্যবস্থাপক
- আন্তর্জাতিক ক্রয় কর্মকর্তা
- পণ্য সংগ্রহ পরিচালক
- বাণিজ্যিক পরিচালক
- প্রতিষ্ঠানের মালিক বা প্রধান নির্বাহী
বিশেষ করে সাও পাওলো, রিও ডি জেনেইরো, পারানা, সান্তা কাতারিনা এবং ব্রাজিলের অন্যান্য শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা যেতে পারে।
পদ্ধতি ২: ব্যবসায়িক নির্দেশিকা ও আমদানিকারকের তথ্যভান্ডার
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক নির্দেশিকা, আমদানি তথ্যভান্ডার এবং ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা তথ্যসূত্র ব্যবহার করে সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করুন। খুঁজুন:
- আমদানিকারক
- পাইকার
- পরিবেশক
- খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান
- নিজস্ব ব্র্যান্ডের মালিক
- শিল্পপ্রতিষ্ঠান
শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম সংগ্রহ করলেই হবে না। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, পণ্যের ধরন, বর্তমান সরবরাহকারী, বাজার অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তার তথ্য সংগ্রহ করুন।
পদ্ধতি ৩: ব্রাজিলের শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠন
ব্রাজিলে খাতভিত্তিক অসংখ্য শক্তিশালী ব্যবসায়িক সংগঠন রয়েছে। পোশাক, বস্ত্র, চামড়া, জুতা, খাদ্য, ওষুধ, সিরামিক, খুচরা বাণিজ্য এবং অন্যান্য খাতের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সংগঠনের মাধ্যমে পরিচিতি তৈরি হলে সম্ভাব্য ক্রেতার আস্থা অর্জন তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
পদ্ধতি ৪: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা
সাও পাওলোসহ ব্রাজিলের বড় শহরগুলোতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
নিজের পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত মেলায় অংশগ্রহণ করে:
- আমদানিকারকের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ;
- নমুনা প্রদর্শন;
- বাজারের মূল্য যাচাই;
- প্রতিযোগীর পণ্য পর্যবেক্ষণ;
- পরিবেশক নির্বাচন; এবং
- সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব।
সরাসরি ব্যবসায়িক সাক্ষাৎ অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন যোগাযোগের তুলনায় দ্রুত আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করে।
পদ্ধতি ৫: ব্যবসায়িক সংযোগ স্থাপন সেবা
পেশাদার ব্যবসায়িক সংযোগ স্থাপন বা ক্রেতা-বিক্রেতা সংযোগ সেবার মাধ্যমে উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে নতুন বাজারে প্রবেশের সময় স্থানীয় ব্যবসায়িক সংস্কৃতি, ভাষা, আমদানি ব্যবস্থা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের সহায়তা কার্যকর হতে পারে।
ধাপ ৬: সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে পেশাদারভাবে যোগাযোগ করুন
শুধু “আমরা বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি করি, আপনি কিনবেন কি?” এ ধরনের বার্তা পাঠালে সাধারণত ভালো ফল পাওয়া যায় না। প্রথম ই-মেইল বা ব্যবসায়িক বার্তায় উল্লেখ করুন:
- প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত পরিচয়;
- কোন পণ্যে বিশেষায়িত;
- কত বছর ধরে ব্যবসা করছেন;
- কোন কোন দেশে রপ্তানি করেন;
- উৎপাদন সক্ষমতা;
- আন্তর্জাতিক সনদ;
- ন্যূনতম অর্ডারের পরিমাণ;
- সম্ভাব্য সরবরাহ সময়;
- পণ্যের তালিকার সংযোগ বা সংযুক্তি; এবং
- অনলাইন বৈঠকের অনুরোধ।
প্রথম যোগাযোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত সরাসরি বিক্রয় নয়; বরং আগ্রহ সৃষ্টি এবং আলোচনা শুরু করা।
ধাপ ৭: পণ্যের নমুনা পাঠান
ব্রাজিলের সম্ভাব্য ক্রেতা আগ্রহ প্রকাশ করলে পণ্যের নমুনা চাইতে পারেন। নমুনা পাঠানোর সময় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখুন।
নমুনার সঙ্গে রাখুন
- পণ্যের বিবরণ
- এইচএস কোড
- উপাদানের বিবরণ
- আকার
- রং
- মোড়কের তথ্য
- উৎপাদন সময়
- ন্যূনতম অর্ডারের পরিমাণ
- মূল্য প্রস্তাব
- প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের তথ্য
মনে রাখতে হবে, আপনার পাঠানো নমুনাই অনেক সময় আপনার কারখানার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।
ধাপ ৮: বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে আলোচনা করুন
ক্রেতা পণ্য ও নমুনা পছন্দ করলে পরবর্তী ধাপ হলো বাণিজ্যিক আলোচনা। প্রধান আলোচ্য বিষয়:
| বিষয় | বিবেচ্য দিক |
| ন্যূনতম অর্ডার | প্রথম অর্ডারে সম্ভব হলে নমনীয়তা |
| মূল্য | পণ্যের ধরন অনুযায়ী |
| অর্থ পরিশোধ | অগ্রিম, ঋণপত্র বা সম্মত নিরাপদ ব্যবস্থা |
| বাণিজ্যিক শর্ত | এফওবি, সিআইএফ বা পারস্পরিক সম্মত শর্ত |
| উৎপাদন সময় | বাস্তবসম্মত সময়সীমা |
| মোড়ক | ব্রাজিলীয় ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী |
| মান | লিখিতভাবে নির্ধারণ |
| পরিদর্শন | প্রয়োজনে চালান-পূর্ব পরিদর্শন |
নতুন ক্রেতার ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিন।
ধাপ ৯: রপ্তানি নথিপত্র প্রস্তুত করুন
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নথিপত্রের ভুল অনেক সময় পণ্যের চেয়েও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে:
বাণিজ্যিক চালান: পণ্যের মূল্য, পরিমাণ, ক্রেতা-বিক্রেতার তথ্য এবং বাণিজ্যিক শর্ত উল্লেখ থাকে।
মোড়ক তালিকা: কতটি কার্টন, ওজন, পরিমাণ, পণ্যের বিবরণ ইত্যাদি থাকে।
জাহাজীকরণ দলিল: সমুদ্রপথে চালানের ক্ষেত্রে বিল অব লেডিং গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
উৎপত্তি সনদ: পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়েছে এটি প্রমাণ করে।
বিমা সনদ: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজন হতে পারে।
পরিদর্শন সনদ: ক্রেতা বা পণ্যের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজন হতে পারে।
এছাড়া পণ্যভেদে স্বাস্থ্য সনদ, উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সনদ, পরীক্ষাগার প্রতিবেদন, মান সনদ বা অন্যান্য অনুমোদন লাগতে পারে।
ধাপ ১০: বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে পণ্য পরিবহন
বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে অধিকাংশ বড় বাণিজ্যিক চালান সমুদ্রপথে পাঠানো সুবিধাজনক। একটি সম্ভাব্য পরিবহন পথ হতে পারে:
চট্টগ্রাম বন্দর → আন্তর্জাতিক স্থানান্তর বন্দর → সান্তোস বন্দর, ব্রাজিল।
তবে জাহাজ কোম্পানি, সময়সূচি ও চালানের ধরন অনুযায়ী পথ পরিবর্তিত হতে পারে। সমুদ্রপথে পরিবহন সময় কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি হতে পারে। তাই অর্ডার নেওয়ার সময় ক্রেতাকে বাস্তবসম্মত সরবরাহ সময় জানাতে হবে। লাতিন আমেরিকার বাজারে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন নির্ভরযোগ্য পণ্য পরিবহনকারী বা মালবাহী সেবাদাতা নির্বাচন করা ভালো।
ধাপ ১১: ব্রাজিলে কাস্টমস ছাড়করণ
সাধারণত ব্রাজিলের আমদানিকারক তার নিজস্ব কাস্টমস প্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার মাধ্যমে পণ্য ছাড় করায়। কিন্তু বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের দায়িত্ব হলো সঠিক নথিপত্র সরবরাহ করা। কাস্টমসে বিলম্বের সাধারণ কারণ:
- ভুল এইচএস কোড;
- চালানের তথ্যের অসামঞ্জস্য;
- পণ্যের বিবরণে ভুল;
- প্রয়োজনীয় সনদের অভাব;
- লেবেলিংয়ের ভুল;
- পণ্যের পরিমাণ ও নথির অমিল; এবং
- নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের সমস্যা।
তাই পণ্য জাহাজীকরণের আগেই ক্রেতার সঙ্গে নথিপত্র যাচাই করা উচিত।
ধাপ ১২: পণ্য পাঠানোর পর নিয়মিত যোগাযোগ করুন
অনেক নতুন রপ্তানিকারক পণ্য পাঠানোর পর মনে করেন কাজ শেষ। বাস্তবে এখান থেকেই দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পণ্য পাঠানোর পর দ্রুত ক্রেতাকে পাঠান:
- জাহাজীকরণ দলিল;
- বাণিজ্যিক চালান;
- মোড়ক তালিকা;
- প্রয়োজনীয় সনদ;
- চালানের অবস্থান জানার তথ্য; এবং
- সম্ভাব্য পৌঁছানোর সময়।
পরিবহনের সময়
ক্রেতাকে নিয়মিত চালানের অগ্রগতি জানান। কাস্টমস বা নথিপত্রসংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন এলে দ্রুত উত্তর দিন। এ ধরনের পেশাদার যোগাযোগ ক্রেতার আস্থা বাড়ায়।
ধাপ ১৩: ব্রাজিলীয় ক্রেতাকে ধরে রাখুন
একজন নতুন ক্রেতা সংগ্রহ করতে অনেক সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়। তাই বিদ্যমান ভালো ক্রেতাকে ধরে রাখা নতুন ক্রেতা খোঁজার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির জন্য
- প্রতিবার একই মান বজায় রাখুন;
- নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করুন;
- অভিযোগের দ্রুত সমাধান করুন;
- ব্যবসায়িক বার্তার দ্রুত উত্তর দিন;
- নতুন পণ্য সম্পর্কে নিয়মিত জানান;
- নতুন নকশা ও সংগ্রহ পাঠান;
- সুযোগ হলে ব্রাজিলে গিয়ে ক্রেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন;
- ক্রেতাকে বাংলাদেশে কারখানা পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান।
একটি কার্যকর যোগাযোগ পরিকল্পনা হতে পারে
| সময় | কার্যক্রম |
| প্রতি মাসে | পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত হালনাগাদ |
| প্রতি তিন মাসে | নতুন পণ্য ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য |
| প্রতি ছয় মাসে | নতুন সংগ্রহ বা নকশা |
| বছরে অন্তত একবার | সরাসরি সাক্ষাৎ বা কারখানা পরিদর্শনের উদ্যোগ |
ধাপ ১৪: বিদ্যমান ক্রেতার মাধ্যমে আরও ব্রাজিলীয় ক্রেতা সংগ্রহ করুন
একজন সন্তুষ্ট ক্রেতা আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী বিপণন মাধ্যম হতে পারেন। সফলভাবে কয়েকটি চালান সম্পন্ন করার পর ক্রেতার কাছে বিনয়ের সঙ্গে চাইতে পারেন:
- ব্যবসায়িক সুপারিশ;
- লিখিত প্রশংসাপত্র;
- অন্য আমদানিকারকের সঙ্গে পরিচয়;
- একই খাতের পরিবেশকের পরিচিতি;
- যৌথ সফলতার উদাহরণ প্রকাশের অনুমতি।
ব্রাজিলের একজন আমদানিকারকের একই শিল্পের অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই ভালো সেবা ও বিশ্বাসযোগ্যতার মাধ্যমে একটি ক্রেতা থেকে আরও অনেক সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
নতুন রপ্তানিকারকদের সাধারণ ভুল
i. শুধু কম মূল্যের ওপর নির্ভর করা: সবচেয়ে কম মূল্য সব সময় সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। মান, নির্ভরযোগ্যতা, সময়মতো সরবরাহ এবং যোগাযোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ii. পেশাদার ওয়েবসাইট না থাকা: বিদেশি ক্রেতা প্রথমে অনলাইনে প্রতিষ্ঠান যাচাই করতে পারেন। তাই ডিজিটাল উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
iii. দুর্বল যোগাযোগ: অপেশাদার ই-মেইল, দীর্ঘ সময় উত্তর না দেওয়া অথবা অসম্পূর্ণ তথ্য ক্রেতার আস্থা নষ্ট করে।
iv. প্রয়োজনীয় সনদকে গুরুত্ব না দেওয়া: ব্রাজিলে পণ্য পাঠানোর আগে সব নিয়ন্ত্রক শর্ত যাচাই করা আবশ্যক।
v. মানের ধারাবাহিকতা না রাখা: নমুনা ভালো কিন্তু মূল চালানের মান খারাপ এমন হলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা গড়ে ওঠে না।
রপ্তানি সফলতার পূর্ণাঙ্গ যাচাই তালিকা
রপ্তানির আগে নিশ্চিত করুন:
- হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স আছে;
- কর নিবন্ধন সম্পন্ন;
- প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর নিবন্ধন সম্পন্ন;
- রপ্তানি নিবন্ধন সনদ রয়েছে;
- ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব প্রস্তুত;
- পেশাদার প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিপত্র রয়েছে;
- পণ্যের বিস্তারিত তালিকা রয়েছে;
- আন্তর্জাতিক মানের পণ্যের ছবি রয়েছে;
- পণ্যের সঠিক এইচএস কোড নির্ধারিত;
- রপ্তানি মূল্য হিসাব করা হয়েছে;
- ব্রাজিলের আমদানি বিধি যাচাই করা হয়েছে;
- প্রয়োজনীয় সনদ ও অনুমোদন যাচাই করা হয়েছে;
- সম্ভাব্য ব্রাজিলীয় ক্রেতার তালিকা তৈরি হয়েছে;
- সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে;
- নমুনা প্রস্তুত;
- অর্থ পরিশোধের নিরাপদ ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে;
- নির্ভরযোগ্য পণ্য পরিবহনকারী নির্বাচন করা হয়েছে;
- রপ্তানি নথিপত্র প্রস্তুত;
- জাহাজীকরণের পর যোগাযোগের পরিকল্পনা রয়েছে।
উপসংহার
বাংলাদেশের জন্য ব্রাজিল শুধু একটি দূরবর্তী লাতিন আমেরিকান বাজার নয়; এটি ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রপ্তানি গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে তৈরি পোশাক ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান শক্তি হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা শুধু পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাট ও পরিবেশবান্ধব পণ্য, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা, ওষুধ, গৃহস্থালি বস্ত্র, সিরামিক, হিমায়িত সামুদ্রিক খাদ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, বাইসাইকেল এবং হালকা প্রকৌশল ও রান্নাঘরের সামগ্রী এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু সম্ভাবনাময় পণ্য নির্বাচন করলেই ব্রাজিলে সফল রপ্তানিকারক হওয়া সম্ভব নয়। একজন নতুন বাংলাদেশি রপ্তানিকারককে প্রথমে নিজের ব্যবসাকে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। এরপর পণ্যের এইচএস কোড, ব্রাজিলের আমদানি বিধি, কর ও শুল্ক, মান, সনদ, লেবেলিং এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক বিষয় যাচাই করতে হবে।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সঠিক ব্রাজিলীয় ক্রেতা খুঁজে বের করা। এজন্য অনলাইন গবেষণা, লিংকডইন, আমদানিকারকের তথ্যভান্ডার, ব্রাজিলের শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল এবং পেশাদার ক্রেতা-বিক্রেতা সংযোগ কার্যক্রম ব্যবহার করা যেতে পারে। সম্ভাব্য ক্রেতা পাওয়ার পর পেশাদারভাবে যোগাযোগ, উন্নতমানের নমুনা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, নিরাপদ অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা এবং সঠিক বাণিজ্যিক শর্ত নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথম অর্ডার পাওয়াই সফলতার শেষ ধাপ নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কের শুরু। সময়মতো পণ্য উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক নথিপত্র, নির্ধারিত সময়ে জাহাজীকরণ এবং পণ্য পাঠানোর পর নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রেতার আস্থা অর্জন করতে হবে। একজন সন্তুষ্ট ব্রাজিলীয় ক্রেতা পরবর্তীতে একই পণ্যের আরও বড় অর্ডার দিতে পারেন, অন্য ব্যবসায়ীর কাছে আপনার প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করতে পারেন এবং ব্রাজিলের নতুন অঞ্চলে আপনার পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারেন।
তাই একজন নতুন রপ্তানিকারকের জন্য কার্যকর কৌশল হতে পারে প্রথমেএকটি সম্ভাবনাময় পণ্য নির্বাচন করুন, ব্রাজিলের বাজার সম্পর্কে গভীর গবেষণা করুন, উপযুক্ত আমদানিকারক ও পরিবেশক চিহ্নিত করুন, তিন থেকে পাঁচজন নির্ভরযোগ্য ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুন, প্রথম কয়েকটি চালান সফলভাবে সম্পন্ন করুন এবং এরপর ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি করুন।
ব্রাজিলে একটি শক্তিশালী বাজার তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে ব্রাজিলকে ভিত্তি করে আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া এবং লাতিন আমেরিকার অন্যান্য বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের জন্য তাই মূলমন্ত্র হওয়া উচিত: সঠিক পণ্য নির্বাচন → বাজার গবেষণা → রপ্তানি প্রস্তুতি → সঠিক ক্রেতা অনুসন্ধান → ব্যবসায়িক যোগাযোগ → নমুনা ও মূল্য প্রস্তাব → নিরাপদ চুক্তি → সঠিক নথিপত্র → সময়মতো জাহাজীকরণ → বিক্রয়-পরবর্তী যোগাযোগ → ক্রেতা ধরে রাখা → নতুন ক্রেতা ও বাজার সম্প্রসারণ।



