মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (টিএণ্ডআইবি)
সম্পাদক, টিএন্ডআইবি বিজনেস ডিরেক্টরি; নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিবিসিসিআই)
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য ব্রাজিল কেবল একটি সাধারণ বিদেশি বাজার নয়; এটি ল্যাটিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক গন্তব্য। ২০২৪ সালে ব্রাজিলের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) প্রায় ২.১৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ২১ কোটি ২০ লক্ষ। দেশটির অর্থনীতি পোশাক, ওষুধ, খাদ্যপণ্য, চামড়াজাত দ্রব্য, গৃহস্থালি পণ্য, শিল্প উপকরণ এবং প্রযুক্তিগত পণ্যের মতো বহু খাতে বিস্তৃত। অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্রাজিলে রপ্তানি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রায় ১৪৭ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১৮৭ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে ব্রাজিল একটি বড় বাজার, যা সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে ব্রাজিল এমন একটি বাজার নয় যেখানে প্রস্তুতি ছাড়াই রপ্তানি করা যায়। ব্রাজিলের আমদানি ব্যবস্থায় পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, আমদানি লাইসেন্সিং, প্রযুক্তিগত মান যাচাই, স্বাস্থ্য অনুমোদন, পণ্যের লেবেলিং এবং আমদানিকারকের নিবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি প্রক্রিয়ায় Siscomex সিস্টেম, LPCO অনুমোদন এবং ANVISA, MAPA অথবা Inmetro-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। তাই কেবল মূল্য নির্ধারণ বা ক্রয়াদেশ পাওয়া ব্রাজিলে সফল রপ্তানির জন্য যথেষ্ট নয়। একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে তার প্রতিষ্ঠান, পণ্য, নথিপত্র এবং ব্রাজিলের আমদানিকারক অংশীদারের প্রস্তুতি আগেই নিশ্চিত করতে হয়।
কেন ব্রাজিলের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
ব্রাজিল একটি বিশাল বাজার হলেও এর আমদানি ব্যবস্থা যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত। ব্রাজিলে আমদানিকারকদের Siscomex প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। একটি পণ্যের আমদানি প্রক্রিয়া নির্ভর করে তার NCM শ্রেণিবিন্যাস এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নিয়মের উপর। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী যদি কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি লাইসেন্স প্রয়োজন হয় তবে সেই কার্যক্রম Siscomex সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নিয়ম আগে থেকেই যাচাই করতে হয়।
এই কারণে ব্রাজিলের জন্য প্রস্তুতিকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে দেখা উচিত। প্রথমত, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, পণ্যকে ব্রাজিলের বাজারের জন্য প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্রাজিলের আমদানিকারককে আইনগতভাবে পণ্য আমদানি করার সক্ষমতা থাকতে হবে। চতুর্থত, উৎপাদন বা চালান পাঠানোর আগে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, লেবেলিং, ডকুমেন্টেশন এবং সার্টিফিকেশন বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয় থাকতে হবে। এই চারটি স্তর সঠিকভাবে প্রস্তুত থাকলে ব্রাজিলে রপ্তানি তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।
ব্রাজিলের জন্য প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, মাছ ও চিংড়ি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, ওষুধ শিল্প, সিরামিক পণ্য, জুতা, সাইকেল এবং প্রকৌশল পণ্য। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রেও তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, মাছ ও চিংড়ি, চামড়া এবং হোম টেক্সটাইলকে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই পণ্যগুলো ব্রাজিলের বাজারে একই নিয়মে প্রবেশ করে না। উদাহরণস্বরূপ, একটি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রয়োজন হতে পারে বৈধ রপ্তানি লাইসেন্স, উৎস সনদ এবং ক্রেতা-নির্ভর মানসম্মত সার্টিফিকেশন। অন্যদিকে একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের DGDA এবং ব্রাজিলের ANVISA-এর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মাছ ও চিংড়ি রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সনদ এবং মান নিয়ন্ত্রণের অনুমোদন প্রয়োজন। আবার প্রকৌশল পণ্য বা শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে Inmetro-এর প্রযুক্তিগত মান যাচাই প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশের আইনি প্রস্তুতি
ব্রাজিলের বাজারে প্রবেশের আগে একটি বাংলাদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের নিজের দেশের আইনি কাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো প্রতিষ্ঠানের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, কর সংক্রান্ত নথি, ব্যাংকিং সম্পর্ক এবং রপ্তানি নিবন্ধন সনদ থাকতে হবে।
বাংলাদেশে রপ্তানি নিবন্ধন সনদ বা Export Registration Certificate (ERC) প্রদান করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর (CCI&E)। এই সনদ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। বর্তমানে ERC আবেদন এবং নবায়ন CCI&E-এর OLM অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র আপলোড করতে হয় এবং নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হয়।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে একটি সুসংগঠিত নথিপত্র সংরক্ষণ ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে থাকা উচিত প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নথি, ট্রেড লাইসেন্স, কর নিবন্ধন, ব্যাংক সনদ, উৎপাদন লাইসেন্স, পণ্যের স্পেসিফিকেশন এবং পূর্ববর্তী রপ্তানির নথিপত্র। এই নথিগুলো ব্রাজিলের আমদানিকারক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রশ্নের দ্রুত উত্তর দিতে সহায়তা করে।
রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি)
রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে মৌলিক রপ্তানি অনুমোদন। এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে প্রদান করা হয়। বর্তমানে এই সনদের জন্য আবেদন OLM অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে করা যায়।
আবেদন প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীকে অনলাইন ফরম পূরণ করতে হয়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র স্ক্যান করে আপলোড করতে হয় এবং নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হয়। সাধারণত প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স শনাক্তকরণ নম্বর, ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির নথিপত্র প্রয়োজন হয়।
ERC পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের কাছে পণ্য রপ্তানি করতে পারে। তাই ব্রাজিলের বাজারে প্রবেশের পূর্বে ERC সংগ্রহ করা একটি অপরিহার্য প্রস্তুতি।
উৎপত্তি সনদ
উৎপত্তি সনদ বা Certificate of Origin বা উৎস সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি নথি যা প্রমাণ করে যে পণ্যটি কোন দেশে উৎপাদিত হয়েছে। ব্রাজিলে আমদানির ক্ষেত্রে এই নথি কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং শুল্ক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে সাধারণত Export Promotion Bureau (EPB) অথবা সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনগুলো Certificate of Origin প্রদান করে। প্রতিটি চালানের জন্য পৃথকভাবে এই সনদ প্রদান করা হয় এবং এর সাথে বাণিজ্যিক চালান, বিল অব লেডিং, প্যাকিং তালিকা এবং অন্যান্য নথি জমা দিতে হয়।
তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার BGMEA-কে উৎস সনদ প্রদানের ক্ষমতা দিয়েছে, যাতে রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। তাই একটি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের উচিত আগেই নির্ধারণ করা যে তাদের চালানের জন্য EPB না BGMEA থেকে উৎস সনদ নেওয়া হবে।
ব্যাংকিং, EXP ফরম এবং শিপমেন্ট ডকুমেন্ট প্রস্তুতি
ব্রাজিলের বাজারে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং এবং শিপমেন্ট সংক্রান্ত নথিপত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রপ্তানি কার্যক্রম সাধারণত অনুমোদিত ডিলার (Authorized Dealer) ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। Export Promotion Bureau এবং বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের EXP ফরম একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এটি Certificate of Origin ইস্যুর জন্য প্রয়োজনীয় নথির মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে তাই তাদের ব্যাংকের সাথে আগেই সমন্বয় করে নিতে হবে। বাণিজ্যিক চালান, রপ্তানি চুক্তি, পেমেন্ট শর্ত, এলসি বা টিটি ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। বিশেষ করে ব্রাজিলের আমদানিকারক যদি দীর্ঘমেয়াদি পেমেন্ট শর্ত বা আংশিক চালানের প্রস্তাব দেয়, তবে ব্যাংকিং ডকুমেন্টেশন আরও সতর্কতার সাথে প্রস্তুত করতে হবে।
বাস্তবে ব্রাজিলে পাঠানো প্রতিটি চালানের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র সেট প্রস্তুত করা উচিত। এর মধ্যে সাধারণত বাণিজ্যিক চালান, প্যাকিং তালিকা, বিল অব লেডিং বা এয়ারওয়ে বিল, Certificate of Origin, পণ্যের স্পেসিফিকেশন এবং প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট অন্তর্ভুক্ত থাকে। এসব নথির প্রতিটি লাইনে পণ্যের বিবরণ, পরিমাণ, ওজন, মূল্য এবং প্রাপকের তথ্য একইভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। নথিপত্রের সামান্য অসামঞ্জস্যও ব্রাজিলের কাস্টমস প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
ব্রাজিলে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
ব্রাজিলের বাজারে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হলো পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করা। ব্রাজিলে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে NCM কোড ব্যবহার করা হয় এবং এই কোডের ভিত্তিতেই আমদানির প্রশাসনিক নিয়ম নির্ধারিত হয়। তাই বাংলাদেশি রপ্তানিকারক এবং ব্রাজিলের আমদানিকারকের যৌথভাবে পণ্যের সঠিক NCM কোড নির্ধারণ করা উচিত।
Siscomex সিস্টেমের মাধ্যমে পণ্যের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যাচাই করা যায়। এই সিস্টেমের মাধ্যমে জানা যায় যে কোনো পণ্যের জন্য আমদানি লাইসেন্স প্রয়োজন কি না, অথবা সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন লাগবে কি না। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী LPCO নামে পরিচিত বিশেষ অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
অনেক রপ্তানিকারক এখানে ভুল করে থাকেন। তারা পণ্যের বাণিজ্যিক নামের উপর নির্ভর করে শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করেন, কিন্তু ব্রাজিলের কাস্টমস আইনের ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত গঠন, উপাদান এবং ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। তাই ব্রাজিলের আমদানিকারকের সাথে সমন্বয় করে সঠিক শ্রেণিবিন্যাস নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাজিলের আমদানিকারকের নিবন্ধন এবং স্থানীয় অংশীদারের প্রস্তুতি
বাংলাদেশি রপ্তানিকারক যতই প্রস্তুত থাকুক না কেন, যদি ব্রাজিলের আমদানিকারক যথাযথভাবে নিবন্ধিত না থাকে তবে রপ্তানি কার্যক্রম সফল হবে না। ব্রাজিলের আমদানিকারকদের Siscomex সিস্টেমে নিবন্ধিত থাকতে হয় এবং তাদের SECEX এর মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হয়।
কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে ওষুধ, খাদ্য, স্বাস্থ্যপণ্য বা প্রযুক্তিগত পণ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রপ্তানিকারকের উচিত ব্রাজিলের অংশীদারের আইনগত সক্ষমতা যাচাই করা।
ব্রাজিলে রপ্তানি করতে হলে একটি দক্ষ স্থানীয় অংশীদার থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশীদারকে অবশ্যই আমদানি প্রক্রিয়া, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, পণ্যের লেবেলিং এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে। অন্যথায় পণ্য বন্দরে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তৈরি পোশাক খাতের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি
তৈরি পোশাক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত। তবে ব্রাজিলের বাজারে পোশাক রপ্তানি করার জন্যও সঠিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই বৈধ ERC থাকতে হবে এবং তাদের কারখানা ও রপ্তানি নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে। WRAP, SMETA, Higg Index, GOTS, OCS এবং OEKO-TEX এর মতো বিভিন্ন সার্টিফিকেশন বর্তমানে এই খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও ব্রাজিলের আমদানির ক্ষেত্রে সব সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক নয়, তবুও বড় খুচরা বিক্রেতা বা ব্র্যান্ডের সাথে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্রাজিলের জন্য পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ফাইবার কম্পোজিশন, সাইজিং, কেয়ার লেবেল, প্যাকেজিং এবং কার্টন মার্কিং সঠিকভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে পর্তুগিজ ভাষায় লেবেলিং প্রয়োজন হতে পারে। তাই উৎপাদনের আগেই ব্রাজিলের ক্রেতার সাথে এসব বিষয়ে সমন্বয় করা উচিত।
পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি
পাট ও পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ব্রাজিল একটি সম্ভাবনাময় বাজার। পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই উপকরণ হিসেবে পাটের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এই পণ্যগুলোর ক্ষেত্রেও রপ্তানির আগে যথাযথ প্রস্তুতি প্রয়োজন।
রপ্তানিকারকের প্রথমে ERC, Certificate of Origin এবং শিপমেন্ট ডকুমেন্ট প্রস্তুত করতে হবে। এরপর পণ্যের উপাদান, ওজন, আকার, ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রস্তুত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা পণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষার রিপোর্টও চাইতে পারেন।
যদি পণ্যটি উদ্ভিদজাত কাঁচামাল বা আধা-প্রক্রিয়াজাত পণ্য হয়, তবে ব্রাজিলের কৃষি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা MAPA এর নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। তাই পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী আগেই যাচাই করা উচিত যে কোনো অতিরিক্ত অনুমোদন প্রয়োজন কি না।
ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি
ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের জন্য প্রস্তুতি সবচেয়ে জটিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই খাত নিয়ন্ত্রণ করে Directorate General of Drug Administration (DGDA)। এই সংস্থা রপ্তানি লাইসেন্স, Free Sale Certificate, Good Manufacturing Practice Certificate এবং Certificate of Pharmaceutical Product ইস্যু করে।
GMP সার্টিফিকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি প্রমাণ করে যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ওষুধ উৎপাদন করছে। এই সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য কারখানাকে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয় এবং প্রয়োজনে পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এরপর CPP এবং Free Sale Certificate সংগ্রহ করতে হয়। CPP বিদেশি দেশে ওষুধ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং Free Sale Certificate দ্বারা প্রমাণ করা হয় যে পণ্যটি উৎপাদনকারী দেশে বৈধভাবে বিক্রি করা যায়।
ব্রাজিলের ক্ষেত্রে ওষুধ আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে ANVISA। এই সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনো ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য ব্রাজিলে বাজারজাত করা যায় না। তাই একটি বাংলাদেশি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্রাজিলে একজন অনুমোদিত স্থানীয় অংশীদারের মাধ্যমে ANVISA নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
মাছ ও চিংড়ি রপ্তানির পূর্বপ্রস্তুতি
মাছ ও চিংড়ি রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এই সনদ প্রদান করে Department of Fisheries এর অধীন Fish Inspection and Quality Control (FIQC)। রপ্তানিকারককে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে স্বাস্থ্য সনদের জন্য আবেদন করতে হয়।
এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স, ERC, চালানপত্র, প্যাকিং তালিকা এবং বিক্রয় চুক্তির নথি প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনে পণ্যের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয় এবং সবকিছু সন্তোষজনক হলে স্বাস্থ্য সনদ প্রদান করা হয়।
ব্রাজিলের ক্ষেত্রে MAPA এর নিয়ম অনুযায়ী প্রাণিজ পণ্য আমদানির জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। পণ্য অবশ্যই অনুমোদিত উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আসতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সনদ থাকতে হবে।
প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কৃষিপণ্যের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি
প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ Food Safety Authority (BFSA) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। BFSA এর অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে রপ্তানিকারকরা স্বাস্থ্য সনদের জন্য আবেদন করতে পারেন।
এছাড়াও উদ্ভিদজাত পণ্যের ক্ষেত্রে Department of Agricultural Extension এর Plant Quarantine Wing থেকে Phytosanitary Certificate সংগ্রহ করতে হয়। এই সনদ প্রমাণ করে যে পণ্যটি কোনো ক্ষতিকর কীট বা রোগ বহন করছে না।
চামড়া, জুতা, সিরামিক, সাইকেল এবং প্রকৌশল পণ্যের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি
চামড়া, জুতা, সিরামিক, সাইকেল এবং বিভিন্ন প্রকৌশল পণ্য সাধারণত ফার্মাসিউটিক্যাল বা খাদ্যপণ্যের মতো স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কঠোর অনুমোদনের আওতায় পড়ে না। তবে এসব পণ্যের ক্ষেত্রেও সঠিক প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানিকারকদের উচিত পণ্যের সঠিক উপাদান, প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, ব্যবহার নির্দেশনা, প্যাকেজিং মান এবং প্রয়োজনে পরীক্ষার রিপোর্ট প্রস্তুত রাখা।
ব্রাজিলের বাজারে অনেক শিল্পপণ্য এবং ভোক্তা পণ্যের ক্ষেত্রে Inmetro নামক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। Inmetro বিভিন্ন পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক মান যাচাই ব্যবস্থা পরিচালনা করে। যদি কোনো পণ্য বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশনের আওতায় পড়ে, তবে সেই পণ্য ব্রাজিলের বাজারে বিক্রি করার আগে নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে।
এই কারণে সাইকেল, বৈদ্যুতিক পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য বা প্রকৌশল সামগ্রী রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকের উচিত আগেই যাচাই করা যে সংশ্লিষ্ট পণ্যটি Inmetro-এর বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় পড়ে কি না।
প্রথম ব্যবসায়িক আলোচনার আগেই যে নথিপত্র প্রস্তুত রাখা উচিত?
ব্রাজিলের সম্ভাব্য ক্রেতার সাথে প্রথম গুরুতর ব্যবসায়িক আলোচনার আগেই একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র সেট প্রস্তুত থাকা উচিত। এর মধ্যে থাকা উচিত প্রতিষ্ঠানের ERC, ট্রেড লাইসেন্স, নিবন্ধন নথি, ট্যাক্স ও ভ্যাট নথি, ব্যাংক সনদ, পণ্যের ক্যাটালগ, প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন, পরীক্ষার রিপোর্ট, উৎপাদন সময়সূচি এবং প্যাকেজিং নমুনা।
নিয়ন্ত্রিত পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথিপত্রও প্রস্তুত রাখতে হবে। যেমন ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে GMP, CPP এবং Free Sale Certificate; খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সনদ; কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে Phytosanitary Certificate; মাছ ও চিংড়ির ক্ষেত্রে FIQC স্বাস্থ্য সনদ। এসব নথিপত্র আগেই প্রস্তুত থাকলে ব্রাজিলের ক্রেতার সাথে আলোচনায় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া ব্রাজিলের বাজারে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেক সময় পণ্যের তথ্য পর্তুগিজ ভাষায় প্রদান করা প্রয়োজন হয়। তাই রপ্তানিকারকের উচিত পণ্যের লেবেল, স্পেসিফিকেশন এবং প্রচারণা সামগ্রীর পর্তুগিজ অনুবাদ প্রস্তুত রাখা।
ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI) কীভাবে সহায়তা করতে পারে?
ব্রাজিলের বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি রপ্তানিকারক মূলত তথ্যের অভাব এবং সঠিক ব্যবসায়িক সংযোগের অভাবে সমস্যায় পড়েন। অনেক সময় পণ্য বা উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও তারা সঠিক আমদানিকারক খুঁজে পান না বা ব্রাজিলের নিয়ন্ত্রক কাঠামো সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না।
এই ক্ষেত্রে Brazil Bangladesh Chamber of Commerce & Industry (BBCCI) একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। এই চেম্বার বাংলাদেশি রপ্তানিকারক এবং ব্রাজিলিয়ান আমদানিকারকদের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে এবং উভয় দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
BBCCI সদস্যদের জন্য ব্যবসায়িক তথ্য, বাজার বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ, বাণিজ্যিক সভা এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল বিনিময়ের মতো বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করতে পারে। বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যাল, খাদ্যপণ্য এবং প্রযুক্তিগত পণ্যের মতো নিয়ন্ত্রিত খাতে BBCCI-এর সহায়তা রপ্তানিকারকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিকারকদের প্রতি আহ্বান জানানো যায় যে তারা BBCCI-এর সদস্য হয়ে ব্রাজিলের বাজার সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করুন এবং সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সুযোগগুলো কাজে লাগান। সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক, বাজার তথ্য এবং ব্যবসায়িক সংযোগের সুবিধা পেতে পারেন।
উপসংহার
ব্রাজিলের বাজারে প্রবেশ করা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় সুযোগ হলেও এটি যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া সম্ভব নয়। ব্রাজিলের বাজারে সফলভাবে প্রবেশ করতে হলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আইনগত প্রস্তুতি, পণ্যের প্রযুক্তিগত মান, নথিপত্রের সামঞ্জস্য এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক অংশীদারের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যাল, মাছ ও চিংড়ি, খাদ্যপণ্য, চামড়া, সিরামিক, সাইকেল এবং প্রকৌশল পণ্যের মতো বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
যে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ব্রাজিলের বাজারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে দেখবে এবং যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করবে, তারাই এই বাজারে সফল হতে পারবে। আর এই যাত্রায় Brazil Bangladesh Chamber of Commerce & Industry-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
